বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং ধানের পরেই গমের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে গমের ভালো ফলন পাওয়া সব সময় সহজ হয় না। অনেক সময় কৃষকরা উন্নত মানের বীজ এবং সার ব্যবহার করার পরেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পান না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বীজের মাধ্যমে ছড়ানো রোগবালাই। এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আধুনিক গম বীজ শোধন পদ্ধতি।
গম চাষে সফলতার চাবিকাঠি: আধুনিক গম বীজ শোধন পদ্ধতি
গম চাষে বেশি ফলন পেতে সঠিক গম বীজ শোধন পদ্ধতি জানা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক নিয়মে বীজ শোধনের ধাপ, রাসায়নিক ও জৈব পদ্ধতি, রোগ প্রতিরোধ কৌশল এবং সফল গম চাষের কার্যকর টিপস বিস্তারিত জানুন এই সম্পূর্ণ গাইডে।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং ধানের পরেই গমের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে গমের ভালো ফলন পাওয়া সব সময় সহজ হয় না। অনেক সময় কৃষকরা উন্নত মানের বীজ এবং সার ব্যবহার করার পরেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পান না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বীজের মাধ্যমে ছড়ানো রোগবালাই। এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আধুনিক গম বীজ শোধন পদ্ধতি।
গমের বীজ বপনের আগে যদি সঠিক নিয়মে শোধন না করা হয়, তবে মাটিতে থাকা বিভিন্ন ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া বীজের অঙ্কুরোদগমে বাধা দেয়। এমনকি চারা গজালেও তা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানে বীজ শোধনকে বলা হয় ফসলের ‘প্রাথমিক বীমা’। আপনি যদি একজন সফল কৃষক বা কৃষি উদ্যোক্তা হতে চান, তবে বীজ শোধনের প্রতিটি ধাপ আপনার নখদর্পণে থাকতে হবে। আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা আলোচনা করব কীভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বীজ শোধন করে আপনি গমের ফলন ২০-৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারেন।
সূচিপত্র
- বীজ শোধন আসলে কী এবং কেন জরুরি?
- গম বীজ শোধনের প্রধান সুবিধাসমূহ
- বীজবাহিত গমের প্রধান রোগসমূহ
- গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে শোধনের ভূমিকা
- রাসায়নিক পদ্ধতিতে গম বীজ শোধন করার নিয়ম
- কার্যকরী ছত্রাকনাশক ও তার মাত্রা
- জৈবিক উপায়ে বা ট্রাইকোডার্মা দিয়ে বীজ শোধন
- অঙ্কুরোদগম হার পরীক্ষা ও বৃদ্ধির উপায়
- বীজ শোধন করার সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা
- সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
- উপসংহার
বীজ শোধন আসলে কী এবং কেন জরুরি?
বীজ শোধন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বীজের উপরিভাগে বা অভ্যন্তরে থাকা রোগজীবাণু ধ্বংস করা হয়। এটি অনেকটা শিশুদের টিকাদানের মতো। বপনের আগে বীজে নির্দিষ্ট পরিমাণ ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করলে মাটি থেকে আসা ক্ষতিকর রোগবালাই থেকে চারা রক্ষা পায়।
আরো পড়ুন,
বাংলাদেশের আবহাওয়া গমের জন্য অনুকূল হলেও আর্দ্রতার কারণে বীজে ছত্রাকের আক্রমণ বেশি হয়। তাই গম বীজ শোধন পদ্ধতি অনুসরণ না করলে শুধু যে ফলন কমবে তাই নয়, পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
গম বীজ শোধনের প্রধান সুবিধাসমূহ
বীজ শোধন করলে একজন কৃষক সরাসরি বেশ কিছু সুবিধা পান:
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: এটি বীজের চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করে যা মাটির ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাককে বাধা দেয়।
- অঙ্কুরোদগম বৃদ্ধি: শোধিত বীজের জীবনীশক্তি বেশি থাকে, ফলে বীজের অঙ্কুরোদগম হার বৃদ্ধি পায়।
- খরচ সাশ্রয়: শুরুতে সামান্য কিছু টাকা খরচ করে বীজ শোধন করলে পরে জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করার প্রয়োজন হয় না।
- সুস্থ চারা: সুস্থ বীজ থেকে সবল চারা গজায় যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে।
বীজবাহিত গমের প্রধান রোগসমূহ
গমের অনেক রোগ আছে যা বীজের মাধ্যমে এক জমি থেকে অন্য জমিতে বা এক বছর থেকে অন্য বছরে ছড়ায়। এর মধ্যে প্রধান হলো:
- লুজ স্মার্ট বা আলগা ঝুল রোগ: এতে গমের শীষ কালো পাউডারের মতো হয়ে যায়।
- ফুট রট বা গোড়া পচা: চারা অবস্থায় গোড়া পচে গাছ মারা যায়।
- লিফ ব্লাইট বা পাতা ঝলসানো রোগ: পাতার উপর বাদামী দাগ পড়ে এবং সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়।এই প্রতিটি রোগ দমনে গম বীজ শোধন পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে শোধনের ভূমিকা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের গমের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো 'ব্লাস্ট রোগ'। এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ করার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো বীজ শোধন। বপনের আগে প্রোভ্যাক্স বা ভিটাভ্যাক্স দিয়ে শোধন করলে এই রোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
রাসায়নিক পদ্ধতিতে গম বীজ শোধন করার নিয়ম
রাসায়নিক পদ্ধতিতে গম বীজ শোধন পদ্ধতি খুবই জনপ্রিয় কারণ এটি দ্রুত ফলাফল দেয়। নিচে এর সঠিক ধাপগুলো দেওয়া হলো:
- বীজ পরিষ্কার করা: প্রথমে বীজ থেকে ময়লা, খড়কুটা এবং পুষ্ট নয় এমন বীজ আলাদা করতে হবে।
- পাত্র নির্বাচন: শোধনের জন্য প্লাস্টিকের ড্রাম বা মাটির গামলা ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো।
- মিশ্রণ তৈরি: বীজের পরিমাণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রার ছত্রাকনাশক সামান্য জলের সাথে মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করুন (শুষ্ক শোধনের ক্ষেত্রে সরাসরি পাউডার মেশানো যায়)।
- ঝাঁকানো: ড্রামের মুখ বন্ধ করে ভালো করে ২-৩ মিনিট ঝাঁকান যাতে প্রতিটি বীজের গায়ে ছত্রাকনাশকের প্রলেপ লাগে।
কার্যকরী ছত্রাকনাশক ও তার মাত্রা
সঠিক ছত্রাকনাশক নির্বাচন না করলে শোধন প্রক্রিয়া বিফলে যেতে পারে। গমের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কিছু উপাদান হলো:
১. প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি (Provax 200 WP): প্রতি কেজি বীজে ২.৫ - ৩.০ গ্রাম।২. ভিটাভ্যাক্স ২০০ (Vitavax 200): এটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয়। ভিটাভ্যাক্স দিয়ে শোধিত বীজের চারা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।৩. কার্বেন্ডাজিম (Carbendazim): এটি একটি অন্তর্বাহী ছত্রাকনাশক। প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে কার্বেন্ডাজিম ব্যবহার করা হয়।
জৈবিক উপায়ে বা ট্রাইকোডার্মা দিয়ে বীজ শোধন
যারা রাসায়নিক মুক্ত জৈব কৃষি পছন্দ করেন, তাদের জন্য জৈবিক উপায়ে বীজ শোধন একটি আশীর্বাদ। এক্ষেত্রে উপকারী ছত্রাক ট্রাইকোডার্মা (Trichoderma) ব্যবহার করা হয়।
পদ্ধতি:
ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি বা হারজিয়ানাম পাউডার প্রতি কেজি বীজে ৫-১০ গ্রাম হারে মিশিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হবে। এটি মাটির ক্ষতিকর ছত্রাক খেয়ে ফেলে এবং গাছের শিকড় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পরিবেশ রক্ষায় এই গম বীজ শোধন পদ্ধতি অনন্য।
অঙ্কুরোদগম হার পরীক্ষা ও বৃদ্ধির উপায়
বীজ বপনের আগে তার অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা পরীক্ষা করা জরুরি। যদি ১০০টি বীজের মধ্যে ৮০টির বেশি চারা গজায়, তবে সেই বীজ বপনের যোগ্য। সঠিক শোধন প্রক্রিয়ায় বীজের সুপ্তাবস্থা ভাঙে এবং বীজের অঙ্কুরোদগম হার বৃদ্ধি পায়। এতে বীজের অপচয় কমে এবং জমিতে চারার ঘনত্ব সঠিক থাকে।
বীজ শোধন করার সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা
যেহেতু ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তাই নিচের সতর্কতাগুলো অবশ্যই মানতে হবে:
- ব্যক্তিগত সুরক্ষা: হাতে গ্লাভস এবং মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন।
- খাদ্য হিসেবে ব্যবহার নিষিদ্ধ: শোধিত বীজ কোনোভাবেই মানুষ বা পশুপাখি খেতে পারবে না।
- শুকানো: শোধন করার পর বীজ কড়া রোদে শুকাবেন না, এতে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। হালকা ছায়ায় শুকিয়ে নিন।
- বপনের সময়: শোধনের ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বীজ বপন করা সবচেয়ে উত্তম।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: বীজ শোধন না করলে কী হতে পারে?
উত্তর: বীজ শোধন না করলে চারা মড়ক, গোড়া পচা এবং ব্লাস্টের মতো মরণঘাতী রোগ হতে পারে, যা আপনার ফলন ৫০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
প্রশ্ন ২: বাড়িতে সংরক্ষিত বীজ কি শোধন করা যায়?
উত্তর: অবশ্যই। নিজের বাড়িতে রাখা বীজ বপনের আগে গম বীজ শোধন পদ্ধতি মেনে শোধন করা আরও বেশি জরুরি।
প্রশ্ন ৩: কার্বেন্ডাজিম না প্রোভ্যাক্স কোনটি ভালো?
উত্তর: গমের ক্ষেত্রে প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি বা ভিটাভ্যাক্স বেশি কার্যকরী কারণ এগুলো বিশেষভাবে বীজবাহিত রোগ দমনে তৈরি।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, গম চাষে অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য আধুনিক গম বীজ শোধন পদ্ধতি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। এটি যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি কার্যকর। সুস্থ বীজ মানেই সুস্থ ফসল, আর সুস্থ ফসল মানেই কৃষকের মুখে হাসি। আপনি যদি গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ করতে চান এবং বীজের অঙ্কুরোদগম হার বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চান, তবে আজই সঠিক ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করার নিয়মটি প্রয়োগ করুন।
আধুনিক কৃষি তথ্য এবং নিয়মিত টিপস পেতে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন। আপনার চাষাবাদ শুভ হোক!

No comments: