ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বুকভরা আশার সঞ্চার হয়েছে। বছরের পর বছর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে স্থবিরতা ও অনিয়ম ছিল, তা থেকে মুক্তি পেতে এখন উন্মুখ লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থী।
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব সংকটের মধ্যে কর্মসংস্থানে নতুন সূর্যোদয়ের আশায় সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি তুলে ধরেছে তরুণ সমাজ। দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন শিল্পায়ন, স্টার্টআপ সহায়তা, সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি এবং টেকসই কর্মসংস্থান নীতি প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উঠে এসেছে এই দাবিগুলোতে। যুবকদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এসব দাবি কতটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারে—জানুন বিস্তারিত বিশ্লেষণ এই লেখায়।
মেধাভিত্তিক সমাজ ও স্বচ্ছ নিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে বেকারত্বের অভিশাপ দূর করাই এখন নতুন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
১. প্রশ্ন ফাঁসের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি
নিয়োগ পরীক্ষায় দীর্ঘদিনের ক্ষত হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অনিকা সরকার মনে করেন, কঠোর পরিশ্রমের পর যখন ডিজিটাল জালিয়াতির খবর আসে, তখন সব স্বপ্ন ভেঙে যায়। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের মতো বড় পরীক্ষায় 'কেন্দ্র কন্টাক্ট' বা ডিভাইসের মাধ্যমে নকল রোধে কঠোর পদক্ষেপ চান তিনি। একই মত ঢাকা কলেজের শফিউল আমিনের; তাঁর মতে, ঘুষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিয়োগ সম্পন্ন হলে তবেই প্রকৃত মেধাবীরা দেশের সেবায় এগিয়ে আসবে।
২. সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য নিরসন
বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হলেও সেখানে সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি প্রকট। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন মনে করেন, বেসরকারি চাকরিতে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা গেলে সরকারি চাকরির ওপর বাড়তি চাপ কমবে। পাশাপাশি নারী কর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
৩. নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারিগরি সমন্বয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র আতিকুর রহমান নিয়োগের একটি কারিগরি সমস্যার দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি জানান, একই দিনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা নেওয়ার ফলে অনেক প্রার্থী সুযোগ হারান। বিভিন্ন নিয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকলে এই সংকট সমাধান করা সম্ভব।
৪. পুলিশ ভ্যারিফিকেশনে রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ
আইইউবিএটির মোহসীন মোস্তফা আরাফাতের মতে, পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা আর্থিক লেনদেন বন্ধ হওয়া জরুরি। ফৌজদারি অপরাধ না থাকলে কেবল ভিন্ন মতের কারণে যেন কারও নিয়োগ আটকে না যায়, সে জন্য একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৫. শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ ও ফলাফল প্রকাশ
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার অর্পা জানান, অনেক দপ্তরে প্রচুর পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। এই স্থবিরতা কাটিয়ে নিয়মিত সার্কুলার এবং দ্রুত ফলাফল প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
৬. ইশতেহারের বাস্তবায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা, নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হলে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, যা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করবে।
৭. সুশাসন ও মেধার মূল্যায়ন
চাকরিপ্রার্থীদের মূল বার্তা একটিই—যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের অধিকার। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের নিয়োগ পরীক্ষা থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করার দাবিও এখন জোরালো। নতুন সরকারের অধীনে গণতন্ত্রের নবযাত্রায় মেধাবীরা তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরে পাবে, এমনটাই প্রত্যাশা দেশের তরুণ সমাজের।

No comments: