আধুনিক প্রযুক্তিতে । কম খরচে বেশি ফলনের সহজ উপায়

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ধানের পরেই গমের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রুটি, বিস্কুট, বেকারি পণ্য থেকে শুরু করে নানা ধরনের খাবার তৈরিতে গমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে গমের যে বিশাল চাহিদা রয়েছে, সেই তুলনায় উৎপাদন বেশ কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে কৃষকদের সঠিক জ্ঞানের অভাব। সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করলে খরচ বেশি হয় কিন্তু ফলন আশানুরূপ হয় না। তবে আশার কথা হলো, সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক গম চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

আধুনিক গম চাষ পদ্ধতি, গম চাষ পদ্ধতি, উন্নত গম চাষ, গম চাষের নিয়ম, গম চাষে লাভ, গম চাষের আধুনিক প্রযুক্তি, wheat farming method, wheat cultivation tips, wheat farming Bangladesh, profitable wheat farming, high yield wheat farming, গম চাষ কৌশল, গম উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি প্রযুক্তি বাংলাদেশ, কম খরচে গম চাষ

আধুনিক গম চাষ পদ্ধতি ব্যবহার করে কম খরচে বেশি ফলন পাওয়ার সহজ উপায় জানুন। জমি প্রস্তুতি, উন্নত বীজ নির্বাচন, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগ দমনসহ গম চাষের সম্পূর্ণ গাইড এখানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।


আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে বীজের সঠিক ব্যবহার, পরিমিত সার প্রয়োগ, সময়মতো সেচ এবং রোগবালাই দমনের মাধ্যমে কম খরচে গমের বাম্পার ফলন পাওয়া যায়। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করব কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ও নিয়মাবলি ব্যবহার করে আপনি গমের উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারবেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

সূচিপত্র:
আধুনিক পদ্ধতিতে গম চাষ কেন করবেন?
গমের জন্য উপযুক্ত মাটি ও জমি তৈরির নিয়ম
গম চাষের সঠিক সময় ও আবহাওয়া
বাংলাদেশে উন্নত জাতের গম নির্বাচন
গমের বীজ শোধন পদ্ধতি ও বীজ বপন
গম চাষে সার ব্যবস্থাপনা (বিস্তারিত তালিকা)
গমের সেচ ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন
গমের রোগ ও প্রতিকার এবং আগাছা দমন
গমের ক্ষতিকর পোকামাকড় ও দমন ব্যবস্থা
আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে ফসল কাটা ও মাড়াই
বৈজ্ঞানিক উপায়ে গম সংরক্ষণ পদ্ধতি
কম খরচে বেশি ফলন পাওয়ার বিশেষ ও গোপন টিপস
উপসংহার

আধুনিক পদ্ধতিতে গম চাষ কেন করবেন? 

অনেকেই মনে করেন কৃষিকাজ মানেই কেবল জমিতে বীজ ছিটিয়ে দেওয়া এবং ফসল কাটার জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক সময়ে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আধুনিক গম চাষ পদ্ধতি কেন আপনার জন্য অপরিহার্য, তার কিছু যৌক্তিক কারণ নিচে দেওয়া হলো:

খরচ সাশ্রয়: আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন পিটিও সিডার (PTO Seeder) বা পাওয়ার টিলার চালিত যন্ত্র দিয়ে একই সাথে জমি চাষ ও বীজ বপন করা যায়। এতে শ্রমিকের খরচ প্রায় ৫০% কমে যায়।

বীজের অপচয় রোধ: সনাতন পদ্ধতিতে হাত দিয়ে বীজ ছিটিয়ে বুনলে অনেক বীজ পাখির খাবারে পরিণত হয় বা মাটির গভীরে গিয়ে নষ্ট হয়। কিন্তু আধুনিক পদ্ধতিতে সারিতে নির্দিষ্ট গভীরতায় বীজ বোনা হয় বলে বীজের অপচয় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

অধিক ফলন: বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে সঠিক মাত্রায় সার ও সেচ প্রয়োগ করার ফলে প্রতিটি গাছ সমান পুষ্টি পায়। গমের শীষ বড় হয় এবং দানা অনেক বেশি পুষ্ট হয়, যা ফলন প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।

রোগবালাই থেকে সুরক্ষা: আধুনিক পদ্ধতিতে বীজ শোধন করে রোপণ করা হয় এবং আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, ফলে ব্লাস্ট বা পাতাপোড়া রোগের মতো ভয়াবহ রোগ থেকে ফসল সুরক্ষিত থাকে।

গমের জন্য উপযুক্ত মাটি ও জমি তৈরি 

গম একটি সংবেদনশীল ফসল, তাই এর জন্য সঠিক মাটি নির্বাচন করা প্রথম এবং প্রধান শর্ত।

মাটি নির্বাচন: 

দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটি গম চাষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। তবে পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এঁটেল-দোআঁশ মাটিতেও গমের দারুণ ফলন পাওয়া সম্ভব। মাটির অম্লত্ব বা পিএইচ (pH) মান ৬.০ থেকে ৭.৫ এর মধ্যে থাকলে গমের বৃদ্ধি সবচেয়ে ভালো হয়। খুব বেশি নিচু জমি যেখানে পানি জমে থাকে, সেখানে গম চাষ করা উচিত নয়।

জমি তৈরি: 

গমের শেকড় মাটির খুব গভীরে প্রবেশ করে না, তাই ধানের মতো জমি খুব গভীরভাবে চাষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলারের সাহায্যে ৩ থেকে ৪ বার আড়াআড়ি চাষ দিয়ে এবং মই দিয়ে মাটির ঢেলা ভেঙে একদম ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। মাটি এমনভাবে সমান করতে হবে যাতে সেচ দিলে জমির সব জায়গায় সমানভাবে পানি পৌঁছায়। জমি তৈরির শেষ পর্যায়ে হেক্টর প্রতি ৫-৬ টন পচা গোবর বা জৈব কম্পোস্ট সার মিশিয়ে দিলে মাটির জলধারণ ক্ষমতা ও উর্বরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

গম চাষের উপযুক্ত সময় ও আবহাওয়া 

গম মূলত শীতকালীন বা রবি মৌসুমের ফসল। গমের ভালো ফলনের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শীত ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রয়োজন।

বাংলাদেশে গম চাষের উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ (অগ্রহায়ণের প্রথম থেকে ২০ তারিখ) পর্যন্ত। এই সময়ে বীজ বপন করলে গমের চারা সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় শীত পায়।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় শীত দেরিতে আসে বা ধান কাটতে দেরি হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে কিছু স্বল্প মেয়াদি জাত রয়েছে যেগুলো ডিসেম্বরের ২০-২৫ তারিখ পর্যন্ত বপন করা যায়। মনে রাখবেন, ডিসেম্বরের পর যত দেরি করে বীজ বোনা হবে, প্রতিদিনের জন্য ফলন হেক্টর প্রতি প্রায় ৪০-৫০ কেজি করে কমতে থাকবে। গমের দানা পুষ্ট হওয়ার সময় (মার্চ মাসে) তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে গমের দানা চিকন হয়ে যায় এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

বাংলাদেশে উন্নত জাতের গম নির্বাচন (H2)

যেকোনো ফসলের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি হলো সঠিক ও উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এ পর্যন্ত আবহাওয়া উপযোগী এবং রোগ প্রতিরোধী বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে। ভালো ফলন পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই বাংলাদেশে উন্নত জাতের গম নির্বাচন করতে হবে। নিচে কয়েকটি জনপ্রিয় জাতের বর্ণনা দেওয়া হলো:

বারি গম-২৮: এই জাতটি মাঝারি উচ্চতার এবং এর পাতা চওড়া হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ৪.৫ থেকে ৫.০ টন। এটি পাতায় দাগ পড়া রোগ প্রতিরোধী।

বারি গম-৩০: এই জাতটি তাপ ও খরা সহিষ্ণু। দেরিতে বপনের জন্যও এটি বেশ উপযোগী। দানা বেশ বড় ও চকচকে হয়।

বারি গম-৩১: এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি গমের ভয়াবহ রোগ 'ব্লাস্ট' প্রতিরোধী। ফলন অত্যন্ত চমৎকার, হেক্টর প্রতি প্রায় ৫.০ টন।

বারি গম-৩২: এটিও একটি উচ্চফলনশীল জাত এবং এর জীবনকাল কিছুটা কম (১০৫-১১৫ দিন)।

বারি গম-৩৩: বর্তমানে এটি সবচেয়ে আধুনিক ও জনপ্রিয় জাত। এটি জিঙ্ক সমৃদ্ধ এবং শতভাগ ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। এর দানায় প্রোটিনের পরিমাণ বেশি থাকে এবং ফলন অন্যান্য জাতের তুলনায় সর্বোচ্চ।

বীজ কেনার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন বীজ যেন প্রত্যয়িত হয় এবং বিএডিসি (BADC) বা অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়।

গমের বীজ শোধন পদ্ধতি ও বীজ বপন

আধুনিক কৃষিতে বীজ শোধন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাটি ও বীজবাহিত বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগ থেকে চারাকে রক্ষা করার জন্য গমের বীজ শোধন পদ্ধতি প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক।

কীভাবে শোধন করবেন: 

প্রতি কেজি গমের বীজের জন্য ৩ গ্রাম 'প্রভ্যাক্স-২০০' (Provax-200 WP) বা 'ভিটাভ্যাক্স-২০০' নামক ছত্রাকনাশক ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। বীজগুলো একটি প্লাস্টিকের পাত্রে নিয়ে পরিমাণমতো ছত্রাকনাশক ও সামান্য পানি ছিটিয়ে ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিতে হবে যাতে প্রতিটি বীজের গায়ে ঔষধের প্রলেপ লাগে। এরপর বীজগুলো ছায়ায় শুকিয়ে বপন করতে হবে। এতে চারা অবস্থায় গমের গোড়া পচা বা চারা মরা রোগ হয় না।

বীজ বপন পদ্ধতি: 

সনাতন পদ্ধতিতে হাত দিয়ে বীজ ছিটিয়ে বোনা হয়, যা একেবারেই অনুচিত। আধুনিক নিয়মে সারিতে বীজ বুনতে হবে। সারির দূরত্ব হবে ২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি)। বীজ মাটির ৩-৪ সেন্টিমিটার গভীরে পুঁততে হবে। বর্তমানে 'পিটিও সিডার' মেশিনের সাহায্যে একই সাথে জমি চাষ, সারিতে বীজ বপন এবং মই দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করা যায়। একর প্রতি সাধারণত ৪০-৪৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।

গম চাষে সার ব্যবস্থাপনা 

মাটির পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত না করলে কোনোভাবেই গমের ভালো ফলন আশা করা যায় না। তাই মাটি পরীক্ষা করে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করাই হলো আদর্শ গম চাষে সার ব্যবস্থাপনা। নিচে একর প্রতি সারের একটি আদর্শ মাত্রা দেওয়া হলো:

  • ইউরিয়া: ৮০-৯০ কেজি
  • টিএসপি (TSP): ৬০-৬৫ কেজি
  • এমওপি (MoP): ৪০-৪৫ কেজি
  • জিপসাম: ৪৫-৫০ কেজি
  • দস্তা বা জিংক সালফেট: ৪-৫ কেজি
  • বোরিক এসিড: ২.৫-৩.০ কেজি (যদি মাটিতে বোরনের অভাব থাকে)

সার প্রয়োগের নিয়ম:

  • জমি তৈরির শেষ চাষের সময় ইউরিয়া সারের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩ ভাগ) এবং অন্যান্য সকল সার (টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক) সম্পূর্ণ মাত্রায় জমিতে সমানভাবে ছিটিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
  • বাকি এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ ভাগ) ইউরিয়া সার গমের প্রথম সেচ দেওয়ার সময় (বীজ বপনের ১৭-২১ দিন পর) উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে যদি জৈব সার বেশি দেওয়া হয়, তবে রাসায়নিক সারের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে আনা যায়।

গমের সেচ ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন

গম যদিও একটি শুষ্ক মৌসুমের ফসল এবং তুলনামূলক কম পানিতে বেঁচে থাকতে পারে, তবুও সর্বোচ্চ ফলন পেতে হলে এর জীবনচক্রে কয়েকটি ধাপে পরিমিত সেচ দেওয়া অত্যাবশ্যক। সঠিক গমের সেচ ব্যবস্থাপনা ফলন ২০-৩০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। সাধারণত গম ক্ষেতে ৩টি সেচের প্রয়োজন হয়:

প্রথম সেচ (মুকুট শিকড় বা CRI পর্যায়): 

বীজ বপনের ১৭ থেকে ২১ দিনের মাথায় এই সেচ দিতে হয়। এটি গমের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেচ। এ সময় গমের চারা থেকে নতুন কুশি এবং মুকুট শিকড় বের হয়। এই সময়ে সেচ না দিলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

দ্বিতীয় সেচ (শীষ বের হওয়ার আগে বা Booting Stage): 

বীজ বপনের ৫০ থেকে ৫৫ দিন পর গমের পেটে যখন শীষ আসতে শুরু করে, তখন দ্বিতীয় সেচ দিতে হয়।

তৃতীয় সেচ (দানা গঠনের সময় বা Grain Filling Stage):

বীজ বপনের ৭৫ থেকে ৮০ দিন পর, যখন গমের দানা দুধালো অবস্থায় থাকে, তখন তৃতীয় সেচ দিতে হয়। এই সেচ দানা পুষ্ট ও ওজনে ভারী করতে সাহায্য করে।

সতর্কতা: 

গম ক্ষেতে যেন কোনোভাবেই পানি জমে না থাকে। পানি জমে থাকলে গমের পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং গাছ মারা যেতে পারে। তাই জমিতে সেচ দেওয়ার পর অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার জন্য নালা বা ড্রেনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

গমের রোগ ও প্রতিকার এবং আগাছা দমন 

গম চাষের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগবালাই। বিশেষ করে বাংলাদেশে গমের কয়েকটি মারাত্মক রোগ দেখা যায়, যার কারণে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। নিচে প্রধান কয়েকটি গমের রোগ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

গমের ব্লাস্ট রোগ (Wheat Blast): 

এটি বর্তমানে গমের সবচেয়ে ক্ষতিকর ও ভীতিকর রোগ। এই রোগে গমের শীষ হঠাৎ সাদা হয়ে যায় এবং শুকিয়ে যায়। দানা একেবারে চিটা হয়ে যায়।

প্রতিকার:

ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত (যেমন- বারি গম-৩৩) চাষ করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। শীষ বের হওয়ার সময় আবহাওয়া মেঘলা ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে এটি ব্লাস্টের জন্য অনুকূল। এমন আবহাওয়া দেখলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে 'নাটিভো ৭৫ ডব্লিউজি' (Nativo) বা 'স্কোর ২৫০ ইসি' প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৬ গ্রাম/মিলি হারে মিশিয়ে ১২-১৫ দিন পর পর দুইবার স্প্রে করতে হবে।

পাতায় দাগ পড়া রোগ (Leaf Blight): 

পাতার ওপর ডিম্বাকার বাদামি রঙের দাগ পড়ে, যা ধীরে ধীরে পুরো পাতায় ছড়িয়ে পাতা শুকিয়ে ফেলে।
প্রতিকার: 'টিল্ট ২৫০ ইসি' (Tilt 250 EC) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

গমের মরিচা রোগ (Rust Disease): 

পাতায় হলদে বা কমলা রঙের মরিচার মতো গুঁড়া দেখা যায়।
প্রতিকার: উপযুক্ত ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে এবং সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।

আগাছা দমন:

জমিতে আগাছা থাকলে তা মাটি থেকে পুষ্টি ও রস শুষে নেয়। বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর প্রথমবার এবং প্রয়োজনে ৫০-৫৫ দিন পর দ্বিতীয়বার নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। বর্তমানে শ্রমিকের খরচ কমাতে 'অ্যাফিনিটি' (Affinity) বা '২,৪-ডি' (2,4-D) জাতীয় আগাছানাশক অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করে খুব সহজেই আগাছা দমন করা সম্ভব।

গমের ক্ষতিকর পোকামাকড় ও দমন ব্যবস্থা 

গমের রোগবালাইয়ের পাশাপাশি কিছু পোকামাকড়ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • জাব পোকা (Aphid): এরা দলবদ্ধভাবে গমের পাতা ও শীষ থেকে রস চুষে খায়। ফলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • দমন ব্যবস্থা: জমিতে আক্রমণ বেশি হলে 'ইমিডাক্লোপ্রিড' (Imidacloprid) গ্রুপের কীটনাশক (যেমন- অ্যাডমায়ার বা টিডো) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

কাটুই পোকা: 

চারা অবস্থায় রাতের বেলায় এই পোকা গমের চারা মাটি বরাবর কেটে দেয়।
দমন ব্যবস্থা: জমিতে পাখি বসার জন্য ডালপালা পুঁতে দেওয়া (পার্চিং) এবং আক্রমণ তীব্র হলে ক্লোরোপাইরিফস জাতীয় কীটনাশক ব্যবহার করা।

আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে ফসল কাটা ও মাড়াই 

গমের শীষ সম্পূর্ণ পেকে যখন সোনালি বা খড় বর্ণ ধারণ করে এবং গমের দানা দাঁত দিয়ে চিবানোর সময় 'কট' করে শব্দ হয়, তখনই বুঝতে হবে গম কাটার উপযুক্ত হয়েছে। ফসল কাটার কাজটি সাধারণত চৈত্র মাসে (মার্চ-এপ্রিল) করা হয়।

ফসল কাটা: 

রোদেলা দিনে সকালের দিকে ফসল কাটা উচিত। বর্তমানে কাস্তে দিয়ে কাটার পরিবর্তে 'রিপার মেশিন' (Reaper Machine) দিয়ে খুব কম সময়ে ও কম খরচে একরের পর একর জমির গম কাটা যায়। বড় খামারীদের জন্য 'কম্বাইন হারভেস্টার' (Combine Harvester) সবচেয়ে ভালো, যা দিয়ে একই সাথে কাটা এবং মাড়াইয়ের কাজ হয়ে যায়।

ফসল মাড়াই:

 ফসল কাটার পর তা জমিতে ফেলে না রেখে দ্রুত মাড়াই করতে হবে। 'পাওয়ার থ্রেশার' বা আধুনিক মাড়াই যন্ত্র ব্যবহার করলে খুব সহজে এবং পরিষ্কারভাবে গমের দানা আলাদা করা যায়। এতে সময়, শ্রম ও খরচ—তিনটিই বাঁচে।  

বৈজ্ঞানিক উপায়ে গম সংরক্ষণ পদ্ধতি 

শুধু ভালো ফলন পেলেই হবে না, সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করতে পারলে গুদামজাত অবস্থায় পোকার আক্রমণে অনেক গম নষ্ট হয়ে যায়। একটি সফল গম সংরক্ষণ পদ্ধতি নিচে তুলে ধরা হলো:
মাড়াই করার পর গমকে প্রখর রোদে ৪ থেকে ৫ দিন খুব ভালোভাবে শুকাতে হবে। গমের আর্দ্রতা অবশ্যই ১০ থেকে ১২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। দাঁত দিয়ে কামড় দিলে যদি দানা শক্ত মনে হয় এবং কট করে ভেঙে যায়, তবে বুঝতে হবে শুকানো ঠিক আছে।


সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের ড্রাম, টিনের ড্রাম বা পলিথিন মোড়ানো মোটা বস্তা ব্যবহার করতে হবে। পাত্রে গম রাখার পর এর ভেতর নিম পাতা, বিষকাটালী পাতা বা নিশিন্দা পাতা শুকিয়ে স্তরে স্তরে দিয়ে দিলে গমের সুড়ি পোকা বা খাপরা পোকার আক্রমণ হয় না। এরপর পাত্রের মুখ সম্পূর্ণ বায়ুরোধী (Air-tight) করে বন্ধ করে দিতে হবে। বেশি পরিমাণ গমের ক্ষেত্রে ফসটক্সিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।

কম খরচে বেশি ফলন পাওয়ার বিশেষ ও গোপন টিপস 

দীর্ঘদিনের গবেষণায় কৃষি বিজ্ঞানীরা আধুনিক চাষাবাদের বেশ কিছু কৌশল বের করেছেন, যা অনুসরণ করলে আপনি অন্য কৃষকদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকবেন:

বীজ কেনার পর তা পানিতে ভিজিয়ে দেখুন। যে বীজগুলো ভেসে উঠবে সেগুলো চিটা বা অপুষ্ট, সেগুলো ফেলে দিন। এতে অঙ্কুরোদগমের হার বেড়ে যাবে।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় রাসায়নিক সারের প্রতি শতভাগ নির্ভরশীল না হয়ে জমিতে ট্রাইকোডার্মা কম্পোস্ট বা কেঁচো সার (Vermicompost) ব্যবহার করুন। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং সারের খরচ অন্তত ৩০% কমিয়ে দেয়।
সমবায় পদ্ধতিতে চাষাবাদ করুন। অর্থাৎ, আপনার এলাকার কয়েকজন কৃষক মিলে একত্রে বড় জমিতে গম চাষ করলে ট্রাক্টর বা হারভেস্টার মেশিন ভাড়া করা সহজ ও সাশ্রয়ী হয়।
গমের জমিতে সাথী ফসল বা ফাঁদ ফসল হিসেবে বর্ডার লাইনে সরিষা বা সূর্যমুখী বুনতে পারেন। এটি ক্ষতিকর পোকা দমনে প্রাকৃতিকভাবে সহায়তা করে।

উপসংহার

বর্তমান বিশ্বে কৃষিকাজ একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যদি তা সঠিক ও আধুনিক উপায়ে করা যায়। আমাদের দেশের কৃষকরা যদি সনাতন পদ্ধতি পরিহার করে উপরের উল্লেখিত বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক গম চাষ পদ্ধতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করেন, তবে গমের উৎপাদন হেক্টর প্রতি ৪ থেকে ৫ টনে উন্নীত করা কোনো কঠিন কাজ নয়। সঠিক সময়ে উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন, পরিমিত সার ও সেচ প্রয়োগ, এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কৃষকের পরিশ্রম ও অর্থ দুই-ই বাঁচাবে। আসুন, আমরা কৃষি আধুনিকায়নের এই যাত্রায় শামিল হই এবং নিজের আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় জোরালো ভূমিকা পালন করি।

0 Comments