বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল মানেই প্রচণ্ড গরম, ঘাম, ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, ঘন ঘন মাথাব্যথা এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে থাকে। তাই এই সময় সুস্থ থাকার জন্য আমাদের শরীরের প্রতি দিতে হবে বিশেষ যত্ন।
গরমে সুস্থ থাকা শুধু আরামের বিষয় নয়, এটি একটি জরুরি স্বাস্থ্যসচেতনতা। নিচে উল্লেখ করা হলো গরমে সুস্থ থাকার জন্য করণীয় ৮টি অত্যাবশ্যক অভ্যাস।
প্রচুর পানি পান করতেই হবে
গরমে সবচেয়ে বেশি যেটা হয় তা হলো পানিশূন্যতা (Dehydration)। ঘামে আমাদের শরীর থেকে পানি, লবণ ও খনিজ উপাদান বের হয়ে যায়। এ সময় পর্যাপ্ত পানি না পেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরে, প্রস্রাব কমে যায়, এমনকি হিটস্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে।
কী করবেন:
- দিনে কমপক্ষে ২.৫–৩ লিটার পানি পান করুন
- ঘামের পর বেশি পানি পান করুন
- খুব ঠান্ডা পানি নয়, হালকা কুসুম গরম পানি পান করাই ভালো
বাড়তি টিপস:
- মাঝে মাঝে ওআরএস/লেবু পানি/সাবলিম পান করুন
- তরমুজ, শসা, কমলালেবু—জলীয় ফল বেশি খান
বাইরে বের হলে মাথা ঢেকে বের হোন
প্রচণ্ড রোদের সময় সরাসরি সূর্যরশ্মি থেকে হিটস্ট্রোক বা হিট এক্সহশন হতে পারে। তাই দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাইরে গেলে অবশ্যই মাথা ঢেকে বের হোন।
উপকরণ:
- সাদা বা হালকা রঙের টুপি
- পাতলা কটন স্কার্ফ
- ছাতা ব্যবহার করা
হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহার করুন যাতে ঘাম সহজে শুকিয়ে যায়।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন
গরমে ভারী খাবার খেলে হজমে সমস্যা হয় এবং শরীর আরও ক্লান্ত অনুভব করে। তাই হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই উচিত।
খাবার তালিকায় রাখুন:
- চালের ভাতের বদলে পান্তা, খিচুড়ি
- টক দই, শসা, লেবু
- ডাল, সবজি, ফল
- মসুর ডাল ও লেবু দিয়ে তৈরি ঠান্ডা স্যুপ
এড়িয়ে চলুন:
- অতিরিক্ত মশলাদার ও ঝাল খাবার
- তেলেভাজা ও ফাস্টফুড
- মিষ্টি পানীয় বা সফট ড্রিংকস
ঘুম ঠিক রাখতে হবে
গরমে ঘুমের ব্যাঘাত হলে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাতে ঘুম ঠিক না হলে দিনের বাকি সময়টা স্ট্রেস ও মাথাব্যথা নিয়ে কাটে।
করণীয়:
- ঘরের ভেতর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন (পাখা/এসি/ঠান্ডা বাতাস)
- ঘুমানোর আগে ঠান্ডা পানিতে পা ধুয়ে নিন
- পাতলা, হালকা কাপড় পরে ঘুমান
দিনে ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম গরমের সময় আরও জরুরি।
ঘামজনিত সমস্যা থেকে ত্বক ও চুলের যত্ন নিন
গরমে অতিরিক্ত ঘামের কারণে অনেক সময় ত্বকে ঘামাচি, ফুসকুড়ি, র্যাশ, বা ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়। চুল থেকেও দুর্গন্ধ ও চুলকানি হতে পারে।
করণীয়:
- দিনে অন্তত ২ বার ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করুন
- ত্বকে অ্যালোভেরা/পাউডার ব্যবহার করুন
- চুলে সপ্তাহে ২ বার হালকা শ্যাম্পু দিন
- গরমে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন (SPF 30+)
পরামর্শ:
- সুতির জামা পরুন
- ভেজা কাপড় পরে বসে থাকবেন না
শরীরচর্চা করুন, তবে সকাল বা সন্ধ্যায়
গরমে শরীরচর্চা একেবারে বন্ধ করলে চলবে না, আবার দুপুরে এক্সারসাইজ করাও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই সময় ও ধরন ঠিক করে এক্সারসাইজ করা জরুরি।
উপায়:
- সকাল ৬টা–৮টার মধ্যে হালকা ব্যায়াম
- সন্ধ্যায় হাঁটা বা ইয়োগা
- হাইড্রেশন নিশ্চিত করুন এক্সারসাইজের আগে ও পরে
খুব বেশি ঘাম ঝরানো ওয়ার্কআউট করবেন না, এতে শরীর ক্লান্ত ও পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
ঘর ঠান্ডা রাখুন ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করুন
অতিরিক্ত গরমে ঘরের ভেতর থাকলেও অনেক সময় তাপ জমে শরীর খারাপ হতে পারে। তাই ঘর ঠান্ডা রাখতে নিচের পরামর্শ অনুসরণ করুন:
টিপস:
- জানালায় পর্দা টানিয়ে দিন
- ঘরের পাখা, এক্সহস্ট ফ্যান, দরজা জানালা খোলা রাখুন
- রাতে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে দিন
প্রয়োজনে ভেজা তোয়ালে বা স্প্রে ব্যবহার করে ঘর ঠান্ডা করুন
হিটস্ট্রোকের লক্ষণ জানুন ও প্রতিক্রিয়া দিন
গরমে সবচেয়ে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি হলো হিটস্ট্রোক। এটি দেরি করে বুঝলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
হিটস্ট্রোকের লক্ষণ:
- মাথা ঘোরা
- শরীর কাঁপা বা ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া
- তীব্র মাথাব্যথা
- বমি বমি ভাব
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
করণীয়:
দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় নিতে হবে
ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে
পানি বা ওআরএস খাওয়াতে হবে
অবস্থা খারাপ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন
গরমে সচেতন থাকাই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি
গরমে অসুস্থ হওয়া প্রায়ই আমাদের ছোট ছোট অবহেলার ফল। একটু সচেতনতা আর নিয়ম মেনে চললেই আপনি এই গ্রীষ্মকাল পেরোতে পারবেন সুস্থ, সতেজ ও কর্মক্ষমভাবে।
আপনি সুস্থ থাকলে পরিবার ও আশেপাশের মানুষগুলোও নিরাপদ থাকবে। তাই নিজের যত্ন নিতে দ্বিধা নয়, বরং এটিই হবে আপনার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

No comments: